আমাদের অনলাইন স্কুল- Turkey & Poultry Masters Community School এ প্রায়ই পোস্ট আসে কারো মুরগি হয়তো ৪.৫মাসে ডিমে চলে আসছে। আবার বিপরীত চিত্রও দেখা যায় অনেকের মুরগি পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরও ডিম দেয় না।

যার মুরগিটি পূর্ণবয়স্ক হওয়ার আগেই ডিম দিচ্ছে সে হয়তো খুশিতে আত্মহারা। আবার যার মুরগি ডিম দিচ্ছেনা সে দুঃশ্চিন্তাগ্রস্ত।
কিন্তু আপনি জানেন কি পরিণত বয়সের পূর্বেই ডিম দেয়া এবং পরিণত বয়স হওয়ার পরও ডিম না দেয়া ০২টাই মোরগ-মুরগির জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং আপনার জন্য আর্থিক লোকসানের কারন।

এরকম হওয়ার বেশ কিছু কারনের মধ্যে অন্যতম প্রধান কারন হচ্ছে আলোক ব্যবস্থাপনার অব্যবস্থাপনা। আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি যে আমাদের দেশের অধিকাংশ পোল্ট্রি খামারী এ বিষয়টি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারনা রাখেনা। ফলে তারা প্রতিনিয়তই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজকে এই আলোক ব্যবস্থাপনা নিয়েই লিখলাম।

☞আলোক ব্যবস্থাপনা কি ?
সাধারণ ভাবে আলোক ব্যবস্থাপনা বলতে আমরা আলোর ব্যবস্থাপনাকেই বলতে পারি। পোল্ট্রি বিজ্ঞানের ভাষায় বিস্তারিত ভাবে বলতে গেলে আমরা আমাদের পোল্ট্রি শেডে মোরগ-মুরগিদের যথাযথ ভাবে বেড়ে উঠার সুবিধার্থে কখনো কৃত্রিম আলো বন্ধ করে আবার কখনো কৃত্রিম আলো প্রদান করে যে অনুকূল পরিবশে বজায় রাখি তাই আলোক ব্যবস্থাপনা।

☞আলোক ব্যবস্থাপনা কেন প্রয়োজন ?
মোরগ মুরগির শারীরিক বৃদ্ধি ঠিক রাখা, প্রজনন স্বাস্থ্য ঠিক রাখা এবং সঠিক সময়ে সঠিক পরিমাণ মাংস ও ডিম উৎপাদনে পোল্ট্রি শেডে যথাযথ নিয়মে আলো প্রদান করা জরুরী।

☞আলোক ব্যবস্থাপনা সঠিক না রাখলে কি সমস্যা হয় ?
#আলো প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে মুরগি পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পরও ডিম দেয় না।
#মুরগি অনেক সময়ই পূর্ণবয়স্ক হওয়ার পূর্বেই ডিম দিয়ে দেয় এর প্রধান কারন হচ্ছে- আলো অতিরিক্ত দেয়া।
#আলোক ব্যবস্থাপনা ঠিক না থাকলে মোরগ-মুরগির প্রজনন স্বাস্থ্য ঠিক থাকেনা।
#মাংস, ডিম বা ডিম হতে বাচ্চা, আলোক ব্যবস্থাপনা সঠিক নাহলে কোনটাই পরিপূর্ণ পাওয়া সম্ভব না।

পোল্ট্রির জন্য কোন বয়সে কত আলো রাখতে হয় ?

 ☞টার্কি, তিতির, লেয়ার, সোনালী বা দেশী প্যারেন্টস এর জন্যঃ- ১ম সপ্তাহে দিনে ২৩ঘন্টা করে আলো দিতে হয়। এরপর প্রতি সপ্তাহে ০১ঘন্টা করে আলো কমাতে হবে। এভাবে কমাতে কমাতে ০৩মাস বয়স পর্যন্ত আলো কমাতে হবে।

এরপর পরবর্তী ০৩মাস পর্যন্ত স্বাভাবিক দিনের প্রাকৃতিক আলোতে রাখতে হবে। এসময় কৃত্রিম আলো দেয়ার কোন প্রয়োজন নাই।

বয়স ০৬মাস পূর্ণ হলে অর্থাৎ ২৪সপ্তাহ হতে দিনে ১২.৫ঘন্টা করে আলো দিতে হবে। এভাবে প্রতি সপ্তাহে ৩০মিনিট করে আলো বাড়াতে হবে।

টার্কি বা মুরগি যখন ডিমপারা শুরু করবে তখন হতে দিনের আলো এবং কৃত্রিম আলো মিলিয়ে মোট ১৬ঘন্টা আলো দিতে হবে।

 ☞যারা টার্কি, সোনালী, দেশী বা ব্রয়লার মাংসের জন্য করবেন তাদের জন্যঃ- মাংসের সকল মুরগির জন্যই ১ম সপ্তাহে দিনে ২৩ঘন্টা করে আলো দিতে হয়। এরপর প্রতি সপ্তাহে ০১ঘন্টা করে আলো কমাতে হবে। টার্কি, সোনালী বা দেশীর ক্ষেত্রে (সোনালী বা দেশী যদি ০৩মাসের বেশী রাখেন সেক্ষেত্রে) এভাবে কমাতে কমাতে ০৩মাস বয়স পর্যন্ত আলো কমাতে হবে। এরপর হতে দিনের প্রাকৃতিক আলো দিলেই হবে। অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন নাই।

পোল্ট্রি শেডে কৃত্রিম আলোর জন্য কোন ধরনের বাল্ব ব্যবহার করবেন ?
 ☞পোল্ট্রি শেডে সাধারণত এনার্জি বা এলইডি বাল্ব অর্থাৎ সাদা আলো প্রদানকারী বাল্বগুলোর ব্যবহার সুবিধাজনক নয়।

আমাদের আশে পাশের দোকান গুলোতে যে ক্লিয়ার ফিলামেন্ট বাল্ব গুলো পাওয়া যায় সেগুলো ব্যবহার করা যেতে পারে। এই বাল্বগুলো সাধারনত হালকা লাল বা অনেকাংশে হালকা কমলা রংয়ের আলো দেয়। যা মুরগির ডিমের উৎপাদন ও ডিমের উর্বরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

ফার্মে মুরগির ক্যানাবলিজম বা ঠুকরা-ঠুকরি রোধে আধুনিক পোল্ট্রি বিজ্ঞানে লাল রংয়ের আলো ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। চাইলে সেটাও করতে পারেন।

এছাড়া ব্রয়লার মুরগিকে শান্ত রাখার জন্য অনেক পোল্ট্রি বিশেষজ্ঞ রাতের বেলায় নীল আলোতে রাখতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এতেকরে মুরগির চঞ্চলতা কিছুটা কমে এবং খাদ্য গ্রহণ ও গ্রোথ স্বাভাবিক থাকে।

বাল্ব কত ওয়াটের ব্যবহার করবেন ?

 ☞প্যারেন্টস ও লেয়ারের জন্যঃ- সাধারনত প্রতি বর্গফুট জায়গার জন্য ০.৬ওয়াট আলো দিতে হয়। বুঝার সুবিধার জন্য বলছি- প্রতি ১০০বর্গফুট জায়গার জন্য ৬০ওয়াটের ০১টা বাল্ব দিলেই হবে। তবে খাঁচায় মুরগি পালনের ক্ষেত্রে সব খাঁচায় পর্যাপ্ত আলো পৌছানোর সুবিধার্থে বাল্বের সংখ্যা কিছু বেশী লাগতে পারে।

 ☞মাংস উৎপাদনের জন্যঃ-সাধারনত প্রতি বর্গফুট জায়গার জন্য ০১ওয়াট আলো দিতে হয়। বুঝার সুবিধার জন্য বলছি- প্রতি ১০০বর্গফুট জায়গার জন্য ১০০ওয়াটের ০১টা বাল্ব দিলেই হবে।

বাল্ব কিভাবে সেট করবেন ?
 ☞বাল্ব গুলো সাধারনত প্রতি ১০০বর্গফুট দূরে দূরে ইংরেজি z অক্ষরের আদলে লাগাতে হবে। বিষয়টি অবশ্যই খেয়াল রাখবেন বাল্বের পজিশন যেন ইংরেজি z অক্ষরের মত জিগজাগ হয়।

 ☞মেঝে হতে বাল্বের উচ্চতা হবে ০২মিটার বা ০৬.৫ফুট। বাল্ব অবশ্যই সিলিং হতে নিচে ঝুলিয়ে দিতে হবে।

☞পরিশেষেঃ
আসুন আমরা বিজ্ঞানসম্মত ফার্মিং শিখি এবং অপর খামারীকে শিখতে সহায়তা করি।
➤বিঃদ্রঃ পোস্টটি পড়ে উপকৃত হলে কপি নয়, শেয়ার করে অন্যদের দেখার সুযোগ করে দিন।

-চাষী মানিক
পরিচালক
শখের খামার এগ্রো প্রজেক্ট
ও এডমিন
Turkey & Poultry Masters Community School